বাড়ি আইন ও বিচার রাহাফের মতো পালিয়েছিলেন আরেক সৌদি তরুণী

রাহাফের মতো পালিয়েছিলেন আরেক সৌদি তরুণী

18
0

বাড়ি থেকে পালিয়ে কানাডায় সদ্য আশ্রয় পাওয়া রাহাফ মোহাম্মদ আল-কুনের গল্প এখন মানুষের মুখে মুখে। তবে পরিবারের অতিমাত্রায় শাসন থেকে বেরিয়ে দম ফেলার জন্য কোনো সৌদি তরুণীর এটাই প্রথম পলায়ন নয়। আট মাস আগে সালওয়া নামের আরেক সৌদি নারী বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন। তবে তিনি একা পালাননি। সঙ্গে নিয়েছিলেন ছোট বোনকে। দুই বোন এখন বাস করছেন কানাডার মনট্রিয়লে। আজ রোববার বিবিসি অনলাইনের খবরে প্রকাশ করা হয়েছে বাড়ি পালানো সালওয়ার গল্প।

বাড়ি থেকে পালানো ১৮ বছর বয়সী সৌদি তরুণী রাহাফ গতকাল শনিবার কানাডায় পৌঁছেছেন। পরিবারের বিরুদ্ধে অতিশাসনের অভিযোগ এনে বাড়ি থেকে পালিয়ে ব্যাংকক গিয়ে বিমানবন্দরে আটকে পড়েন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা কুয়েতে ছিলেন। তিনি কুয়েত থেকে ব্যাংকক হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে ব্যাংকক থেকে তাঁকে কুয়েতে ফেরত পাঠানোর জন্য বিমানবন্দরের ভেতরে অবস্থিত হোটেলে রাখলে সেখানে তিনি নিজেকে তালাবদ্ধ করে রাখেন। রাহাফ কুয়েতে ফিরতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, তিনি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেছেন। পরিবারে ফিরলে তাঁকে মেরে ফেলা হবে। তিনি টুইটারে এ নিয়ে একের পর এক পোস্ট দিলে তা আন্তর্জাতিক মহলের নজরে পড়ে।

সালওয়ার গল্পটিও প্রায় একই রকম। তবে তাঁর বিষয়টি টুইটারে প্রচার না করায় সে সম্পর্কে লোকজন কমই জানেন। রাহাফের ঘটনাটি সামনে নিয়ে এসেছে সালওয়ার ঘটনাটিকেও। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে সৌদি আরবের পরিবারগুলোতে নারীর প্রতি অতিরক্ষণশীলতার বিষয়টি।

সালওয়া জানান, তিনি ও তাঁর ১৯ বছর বয়সী ছোট বোন ছয় বছর ধরে বাড়ি থেকে পালানোর পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এর জন্য তাঁদের প্রয়োজন ছিল পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র। আর প্রয়োজনীয় এ দুটি জিনিস হাতে পেতে হলে তাঁদের অভিভাবকের সম্মতি লাগবে। সৌদি আরবের নিয়ম অনুসারে, এ ধরনের বিষয়ে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের অনুমতি থাকতে হয়। সালওয়া জানান, ভাগ্যক্রমে এ দুটি তাঁর ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন বলে তাঁর পরিবার জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। এ ছাড়া দুই বছর আগে ইংরেজি ভাষার একটি পরীক্ষার জন্য তাঁকে পাসপোর্ট করতে হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট থাকলেও সেগুলো তাঁর হাতে ছিল না। পরিবারের কাছে ছিল। এগুলো নিজের হাতে আনার প্রয়োজন ছিল তাঁর।

এগুলো হাতে পেতে ভাইয়ের বাসার চাবি চুরি করেন সালওয়া। পরে সেই চাবি থেকে একটি হুবহু চাবি বানিয়ে নেন। পরিবারের লোকজনের সম্মতি ছাড়া তিনি কোথাও বের হতে পারতেন না। তাই তাঁরা ঘুমিয়ে গেলে বাইরে বের হতেন। ব্যাপারটি খুবই বিপজ্জনক ছিল। ধরা পড়লেই তাঁকে মার খেতে হবে। সালওয়া জানান, চাবি বানানোর পর তিনি নিজের এবং ছোট বোনের পাসপোর্ট নিজের কাছে নিয়ে আসেন। বাবা ঘুমিয়ে থাকার সময় বাবার ফোনও নিয়ে নেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাবার অ্যাকাউন্টে তিনি লগড ইন করে প্রবেশ করেন এবং তাঁর নিবন্ধিত নম্বরটি নিজের নম্বরে পরিবর্তন করে নেন। বাবার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তিনি দুই বোনের দেশ ছাড়ার ব্যাপারে বাবার সম্মতি দেওয়ার কথা জানান।

দুই বোন এক রাতে বাড়ি থেকে পালান এবং বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে জার্মানির উদ্দেশে রওনা দেন। ওই দিনের কথা মনে হলে এখনো তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসে বলে জানালেন সালওয়া। বাড়ির সবাই ঘুমাচ্ছিলেন, ওই সময় তাঁরা চুপিচুপি বেরিয়ে আসেন। প্রতি মুহূর্তে ধরা পড়ার ভয়ে বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ করছিল। তাঁরা একটি ট্যাক্সি ভাড়া করেন। সৌদি আরবের বেশির ভাগ ট্যাক্সিচালক বিদেশি হওয়ায় তাঁদের একা চলার বিষয়টি নিয়ে চালক মাথা ঘামাননি। তাঁর মনে হচ্ছিল, কেউ যদি এটা খেয়াল করত যে তাঁরা দুই বোন বাসা থেকে পালিয়েছেন, তাহলে নির্ঘাত খুন হতেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে সালওয়া একটি হাসপাতালে চাকরি করেছিলেন। বেতনের অর্থ জমিয়ে রেখেছিলেন। এ ছাড়া বেকার ভাতা থেকেও যা পেতেন, জমিয়ে রেখেছিলেন। ফলে উড়োজাহাজের টিকিট কিনতে কোনো অসুবিধা হয়নি। সালওয়া বলেন, তিনি ও তাঁর বোন জার্মানি যাওয়ার ফ্লাইটে চড়ে বসেন। জীবনে প্রথম তিনি উড়োজাহাজে চড়েছিলেন। তাঁর একই সঙ্গে আনন্দ হচ্ছিল, আবার ভয়ও লাগছিল। পরে বাবা তাঁদের বাড়িতে দেখতে না পেয়ে পুলিশে খবর দিয়েছিলেন। তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাবার অ্যাকাউন্টে ঢুকে ফোন নম্বর পাল্টে দেওয়ার কারণে কর্তৃপক্ষ তাঁর বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করেও পায়না। কারণ, ফোন চলে আসছিল তাঁর নম্বরে। উড়োজাহাজ থেকে নামার পর তিনি নিজের ফোনে কর্তৃপক্ষের বার্তা পান। আসলে তো সেই বার্তাগুলো পাঠানো হয়েছিল তাঁর বাবাকে। ফোন নম্বর বদলে দেওয়ায় সেসব বার্তা চলে আসে তাঁর কাছে।

সালওয়া বলেন, সৌদি আরবে কোনো জীবন ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন আর ঘরে ফিরে আসতেন। সারা দিন তাঁর কিছুই করার ছিল না। বাসা থেকে সব সময় বলা হতো পুরুষেরাই সব। জার্মানিতে পৌঁছে তিনি আশ্রয় চেয়ে আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিজের ঘটনা খুলে বলেন। তিনি বলেন, ‘আশ্রয়ের জন্য আমি কানাডাকে বেছে নিই। কারণ মানবাধিকারের জন্য কানাডার খ্যাতি আছে। সিরিয়ার শরণার্থীদের কানাডার আশ্রয় পাওয়ার খবর পড়ে মনে হয়েছিল, কানাডাই হতে পারে আমার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা। আমার আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর টরন্টোতে চলে আসি। কোনো কিছু অর্জনের এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল আমার।’

ছোট বোনকে নিয়ে এখন মনট্রিয়লে থাকেন সালওয়া। তিনি বলেন, এখানে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। কেউ তাঁকে কিছু করার জন্য বাধ্য করে না। সৌদি আরবে তাঁদের অর্থ ছিল বেশি, কিন্তু এরপরও কানাডার জীবন তাঁর কাছে আগের চেয়ে অনেক ভালো লাগে। ফরাসি ভাষা শিখছেন। সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা ও আইস স্কেটিং শিখছেন। পরিবারের সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ নেই। দুই পক্ষের জন্যই এটা ভালো বলে মনে করেন তিনি।

সালওয়া বলেন, ‘এখন বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় আমার কারও অনুমতি নিতে হয় না। এটা আমাকে খু্ব আনন্দ দেয়। নিজেকে মুক্ত মনে হয়। আমার যা ইচ্ছে হয়, তা-ই পরি। শরতের রং এবং তুষারপাত ভালোবাসি। মনে হয়, জীবনে কিছু একটা করছি।’

আরও পড়ুন:

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here