বাড়ি ঢাকা নিউজ পতিত জমিতে মুনাফার খোঁজ

পতিত জমিতে মুনাফার খোঁজ

14
0

চুক্তিভিত্তিক কৃষকদের কাছ থেকে কাসাভা কিনে নিজেদের কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে স্টার্চ উৎপাদন করে প্রাণ গ্রুপ। এসব স্টার্চ বস্ত্র ও ওষুধ কারখানায় সরবরাহ করা হয়। সম্প্রতি প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জ প্রাণের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে। ছবিটি প্রাণের সৌজন্যে

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলাটি চায়ের জন্য বিখ্যাত। সেখানকার টিলায় টিলায় চা আবাদ করেন বাগানমালিকেরা। তবে এখনো অনেক টিলা অনাবাদি পড়ে আছে। সেখানে নতুন আশা জাগাচ্ছে নতুন ফসল কাসাভা, যা চাষ করছেন স্থানীয় চাষিরা।

চাষিদের একজন রাজীব কুমার রায়। শ্রীমঙ্গলের কালাপুর ইউনিয়নের মাজডিহি গ্রামের হুদারপাড়ে ৬০ একর টিলার জমি ইজারা নিয়ে কাসাভা আবাদ করেছেন। তাঁর মোট ব্যয় হবে ১০ লাখ টাকার মতো। সব খরচ বাদ দিয়ে তাঁর ৫ লাখ টাকার মতো মুনাফার আশা করছেন তিনি। অবশ্য বিনিয়োগের সিংহভাগই তিনি প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে পেয়েছেন, যারা কাসাভা চাষে উৎসাহ দিয়ে তা কিনে নেয়।

কাসাভা একটি কন্দাল ফসল, যা স্থানীয়ভাবে শিমুল আলু নামে পরিচিত। কাসাভার রস থেকে পাউডার তৈরি হয়। এই পাউডার তরল করে স্টার্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয় দেশের বস্ত্র ও ওষুধশিল্পে। বস্ত্রশিল্পে সুতা ও কাপড়ের স্থায়িত্ব বাড়াতে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে স্টার্চ আমদানি করা হয়। সাধারণ মানুষ যেমন সুতি শাড়িতে ভাতের মাড় ব্যবহার করে, তেমনি বস্ত্র খাতে সুতা ও কাপড়ে স্টার্চ ব্যবহার করা হয়।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ জানিয়েছে, দেশে বছরে সাড়ে তিন লাখ টন স্টার্চ আমদানি হয়। দেশে উৎপাদিত হয় ৬ হাজার টনের মতো। বাকিটা ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হয়। দেশে ২০১৪ সাল থেকে প্রাণ চুক্তিভিত্তিক কাসাভার চাষ শুরু করেছে। বছরে এখন প্রায় ৬ হাজার একর জমিতে কাসাভা আবাদ হচ্ছে। ফসলটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এটি অনাবাদি জমিতে চাষের উপযোগী। যেখানে আর কিছু হয় না, সেখানে কাসাভা চাষ সম্ভব। বিশেষ করে পাহাড়ি ও টিলায় এটি ভালো হয়।

সম্প্রতি বেশ কয়েকজন সাংবাদিক মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে কাসাভার চুক্তিভিত্তিক চাষ এবং এর উৎপাদনপ্রক্রিয়া সরেজমিনে ঘুরে দেখেন। সাংবাদিকেরা যখন শ্রীমঙ্গলের কালাপুরে পৌঁছান, তখন রাজীব কুমার রায়ের জমিতে কাসাভা তোলা হচ্ছিল। ওখানে যাওয়ার পথে রাস্তার দুই পাশে টিলার ওপর অনেক চা–বাগান দেখা গেল। আবার অনেক টিলা ফাঁকা দেখা যায়।

এ রকমই এক টিলার জমি ইজারা নিয়ে কাসাভা আবাদ করেছেন রাজীব কুমার। তিনি জানান, প্রতিবছর নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে কাসাভা গাছের কাণ্ড মাটিতে পুঁতে দিলে সেখান থেকে ৫-৬টি করে গাছ হয়। ওই সব গাছের গোড়ায় আলু হয়। তিনি বলেন, ভালো ফলন পেতে কিছু সার ও গাছ ছোট থাকা অবস্থায় আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হয়। এ ছাড়া বিশেষ কোনো যত্নের প্রয়োজন হয় না। তবে গাছের বড় শত্রু পানি। এ জন্য উঁচু জমিতে কাসাভা চাষ করতে হয়। গাছ উঠিয়ে কাসাভা তোলার পর কাণ্ড কেটে মাটিতে পুঁতে দিলেই নতুন গাছ হয়। ফলে চারা কিনতে হয় না।  

রাজীব কুমার রায়ের বাগানেই পাওয়া যায় মাসুক মিয়া নামের এক চাষিকে। তিনি সিলেটের কানাইঘাটে ২০০ একর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৫০ একর জমিতে কাসাভার আবাদ করেছেন। এ জন্য ৮০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে, যা পুরোটাই ঋণ হিসেবে দিয়েছে প্রাণ। তিনি বলেন, সিলেটের কানাইঘাটের জমি ব্রিটিশ আমল থেকে অনাবাদি, যার মালিক স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তাঁকে অনেক বুঝিয়ে জমি ইজারা নিতে হয়েছে। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জমিতে সবজির আবাদ হতো।

মাসুক মিয়া বলেন, সবজি চাষে যে পরিমাণ ব্যয় হয় এবং যত্ন নিতে হয়, সে অনুযায়ী লাভ হয় না। কিন্তু কাসাভায় ভালো লাভের আশা আছে। সিলেটের কানাইঘাটে তাঁর ইজারা নেওয়া জমির মালিক আগে কিছুই পেতেন না। এখন বছরে ইজারামূল্য বাবদ দুই লাখ টাকা পাবেন।

মাসুক মিয়ার আশা, ৮০ লাখ টাকা আবাদের ব্যয়সহ কাসাভা তোলা এবং কারখানায় নিতে তাঁর মোট ১ কোটি টাকা ব্যয় হবে। তিনি দেড় কোটি টাকার কাসাভা বিক্রি করতে পারবেন। প্রাণ এ বছর প্রতি টন কাসাভা সাড়ে ৭ হাজার টাকা দরে কিনছে। মাসুক মিয়া বলেন, প্রাণের কাছ থেকে একরপ্রতি ১৭ হাজার টাকা ঋণ, চাষের পরামর্শ, চারা ইত্যাদি পান তিনি। আবার পণ্য কেনার নিশ্চয়তাও দেয় প্রাণ।

হবিগঞ্জে প্রাণের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে কাসাভা প্রক্রিয়াকরণ কারখানা রয়েছে। সেখানে এখন ব্যস্ততার সময়। কৃষকের খেত থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাসাভা ট্রাকে করে প্রাণের কারখানায় ঢুকছে। সেখান থেকে তা স্টার্চ হয়ে দেশের বড় বড় বস্ত্র কারখানায় যাচ্ছে। প্রাণের পাশাপাশি আরেকটি কোম্পানি দেশে কাসাভা থেকে স্টার্চ তৈরি করে। স্টার্চের দাম প্রতি কেজি ৫২-৬৫ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে।

প্রাণ অ্যাগ্রো বিজনেসের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মাহতাব উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের স্টার্চের মান খুব ভালো। এ কারণে প্রাণের স্টার্চের চাহিদা লেগেই থাকে। প্রাণ কাসাভা আবাদ বাড়াতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, থাইল্যান্ডে কাসাভার ফলন পাওয়া যায় বছরে দুবার। বাংলাদেশে ওই রকম জাত আনা গেলে কৃষকের সুবিধা হতো। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ বিষয়ে গবেষণার উদ্যোগ নিতে পারে।

উন্নত জাতের পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তদারকি চান কৃষকেরা। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার চাষি লিটন দত্ত
বলেন, সরকার কাসাভাকে অর্থকরী ফসল হিসেবে স্বীকৃতি দিক।

শ্রীমঙ্গলে কাসাভা মানুষের কর্মসংস্থানও তৈরি করছে। শীতে যখন কাসাভার মৌসুম শুরু হয়, তখন চা–বাগানে কাজ থাকে না। অস্থায়ী
শ্রমিকেরা কাজের সুযোগ পান কাসাভার খেতে। রাজীব কুমার রায়ের বাগানে কাজ করছিলেন শ্রীমঙ্গলের সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বিধান মুন্ডা। তিনি বলেন, চা–বাগানে স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১০২ টাকা। কাসাভা খেতে কাজ করে পাওয়া যায়
২২০ টাকা। তাই কাসাভা স্থানীয় মানুষের বাড়তি আয়ের পথ করেছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here